July 7, 2026, 10:57 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায় অনেক সমর্থকের কাছে হতাশাজনক হলেও, পুরো টুর্নামেন্ট বিবেচনায় নিলে এই বিদায়কে খুব একটা অপ্রত্যাশিত বলা যায় না। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে। তবে এই একটি ম্যাচের ফলই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি; বরং পুরো আসরজুড়েই ব্রাজিল এমন কোনো নৈপুণ্য দেখাতে পারেনি, যা তাদের শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করত।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল বরাবরের মতোই আকাশচুম্বী। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া দলটি আক্রমণভাগে বৈচিত্র্য আনতে পারলেও মাঠে সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিক প্রয়োগ খুব কমই দেখা গেছে। দলটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল ছন্দের অভাব। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে বল সরবরাহ, দ্রুত পাসিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার ক্ষেত্রে ব্রাজিল বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল প্রয়োজনীয় ফল পেলেও তাদের খেলা কখনোই দর্শকদের মধ্যে সেই পুরোনো সাম্বা ফুটবলের আবহ তৈরি করতে পারেনি। একাধিক ম্যাচে জয় এলেও তা ছিল সংগ্রাম করে আদায় করা। প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে আধিপত্য বিস্তার করার দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে। বল দখলে এগিয়ে থেকেও গোলের সুযোগ তৈরিতে তারা ছিল অকার্যকর।
শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে সেই সীমাবদ্ধতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও ব্রাজিল আক্রমণের গতি বাড়াতে পারেনি। ব্যক্তিগত দক্ষতার ঝলক দেখা গেলেও দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিপক্ষের সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে গিয়ে ব্রাজিল বারবার একই ধরনের আক্রমণে নির্ভর করেছে, যা সহজেই সামাল দিয়েছে নরওয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতা। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ভালো পারফরম্যান্স করলেও পুরো দল হিসেবে তারা নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। রক্ষণভাগে অপ্রয়োজনীয় ভুল, মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব এবং আক্রমণে কার্যকর ফিনিশিংয়ের সংকট শেষ পর্যন্ত তাদের মূল্য দিতে হয়েছে।
এছাড়া আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুধু তারকানির্ভরতা আর সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের দলগুলো এখন কৌশলগতভাবে অনেক বেশি পরিণত। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ দলীয় খেলায় তারা ব্রাজিলের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকেও চাপে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
অনেক সমর্থক মনে করেন, ব্রাজিলের বিদায় একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কখনোই শিরোপাজয়ী দলের মতো ধারাবাহিক ফুটবল খেলতে পারেনি। কয়েকটি মুহূর্তে প্রতিভার ঝলক থাকলেও পুরো ম্যাচজুড়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, আক্রমণে বৈচিত্র্য এবং মানসিক দৃঢ়তার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায় কি অনিবার্য ছিল? তাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিচার করলে উত্তরটি অনেকটাই ইতিবাচক। কারণ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যে ধারাবাহিক নৈপুণ্য, কৌশলগত পরিপক্বতা এবং দলীয় সমন্বয় প্রয়োজন, এই ব্রাজিল তা দেখাতে পারেনি। ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিলের গৌরবময় অতীত যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, বর্তমানের বিশ্ব ফুটবলে নামের চেয়ে পারফরম্যান্সই শেষ কথা। আর সেই পরীক্ষায় এবারের ব্রাজিল প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।